বাবু সাজিবার বিড়ম্বনা
আমার নাম গোপীচন্দ্র খাটুয়া। ইস্কুলের সহপাঠীরা নাম এর পেছনের
'চন্দ্র'কে সরাইয়া অনাবশ্যক 'যন্ত্র' জুড়িয়া ডাকে। প্রথম প্রথম আমি
ক্ষেপিয়া যাইতাম। তাহাতে সহপাঠীর দ্বিগুন উৎসাহ পাইত। বর্তমানে আমি মানাইয়া
লইয়াছি। আমি প্রত্যেক ক্লাসে ডাবল ফেল করিয়া নবম শ্রেণীতে উঠিয়াছি। শিঙ
ভাঙ্গা বলদের বাছুরের দলে মেশার মতো, আমি দাড়ি গোঁফ চাঁছিয়া, ন্যাকা
ন্যাকা কথা বলিয়া নিজেকে মানানসই করিয়াছি।
একদিন আমরা নরদুর্লভ বাবুর ক্লাস করিতেছিলাম। জীবন্ত কঙ্কাল নরদুর্লভ
বাবুকে আমরা 'দুর্বল' বাবু বলিয়া ডাকিতাম। আমি নিত্য দিনের মতো সবার পেছনে
একটি কোনে বসিয়াছি আর তেরোবার মেরামত করা জুতাটা দেখিয়া অনুমান করিতেছিলাম
পথিমধ্যে মাথায় উঠিবে কি না ? হঠাৎ 'দুর্বল'বাবু আমার দিকে একটি শব্দভেদী
বান ছুঁড়িলেন - "বলত গোপী ফুটবল বানান কি ?" আমি ইতিপূর্বে বানানটার পরিচয়
পাইয়াছি গ্রামের টেনিসবল প্রতিযোগিতায়। তবে 'F'-এর পরে একটা 'O' আছে ,না
দুটো ,তা লইয়া কিছুটা ধ্বন্দে পড়িলাম। তারপর ভাবিলাম ,বলিয়া ফেলি
,কাছাকাছিতো যাইবে। আমি গর্বিতভাবে বলিলাম -'Fotbal'। তাহাতে ক্লাসে একটা
হাস্যরোল উঠিল। আমি দমিয়ে গেলাম। দুর্বলবাবু দাঁত খিঁচাইয়া কহিল -"আর একটা
'O ' আর 'L' কি খাইয়া ফেলিয়াছ "। আমি অমতা অমতা করিয়া করিয়া কহিলাম -
"মাস্টারমশাই, আপনি ৫ নম্বর বলের বানান কহিতেছেন, আমিতো ২ নম্বর বলের
কহিয়াছি তাই একটা করিয়া 'O ' আর 'L ' লাগাই নাই। ক্লাসে বিপুল হাস্য রোল
দেখা দিল। দুর্লভবাবু আমার দিকে বেত লইয়া তাড়াইয়া আসিতেছে দেখিয়া আমি জুতা
আর বই ফেলিয়া রূদ্ধশ্বাসে সেই যে দৌড় লাগাইলাম, আর কখনো ইস্কুলের ত্রি
সীমানায় যাই নাই।
ইস্কুল হইতে পালাইয়া স্টেশনে মনের দুঃখে বসিয়াছিলাম। বাড়িতে কি কহিব - তাহাই ভাবিতেছিলাম। হঠাৎ স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের উপর একটি বিজ্ঞাপনের দিকে নজর পড়িল। "গৃহ ভৃত্য চাই "। মাথায় বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল। নাচিতে নাচিতে বাড়ি গেলাম। যাইয়া বাবাকে কহিলাম ,"পড়িয়া কিসসু হইবে না "। পাড়ার দু চারটা বেকার যুবকের উদাহরণ দিলাম। -"তাহার চেয়ে কারখানায় কাজ লইলে তোমার সাহায্য হইবে - বুড়া বয়সে একটু আরাম পাইবে।" বাবা ভাবিয়াছিল আমাদের বংশে কেহ মাধ্যমিক পাশ করে নাই। আমি যদি তিন চার বার চেষ্টা করিয়াও মাধ্যমিক পাশটা করিয়া লই তাহাতে বংশের মুখোজ্ব্ল হইবে। ইদানিং বাবা আমার পড়ার দৌড় দেখিয়া ১৪বারের চেষ্টাতেও মাধ্যমিকের গন্ডি পারাইতে পারিব- সে আশা ছাড়িয়া দিয়াছেন। তাই আমার সংসাররূপ কারখানায় যোগদানের কোনো বাধা রইল না।
আমার মাইনে ৩০০ টাকা ঠিক হইয়াছে। গৃহস্বামী বেশ সুপুরুষ এবং রুচিসম্মত জামাকাপড় পরেন। সকলে বেশ সম্ভ্রম দেখায়। আমি যখন গৃহস্বামীর সাথে যাই তখন নিজের মলিন বেশের দিকে তাকাই, নিজেকে কেমন রামের হনুমানের মতো লাগে। মনে মনে ভবিতাম, আমার যদি এমন শার্ট-প্যান্ট, আর গগলেস থাকিত আমাকে সবাই সম্ভ্রম করিত।
একদিন সুযোগ আসিয়া গেলো। গৃহস্বামী ৭দিনের জন্য ভ্রমণে গেলেন। আমার বাড়ি সামলাইবার দায়িত্ব। মনে মনে স্থির করিয়া ফেলিলাম , বাবুর রেখে যাওয়া প্যান্ট শার্ট আর গগলস পরিয়া সিনেমায় 'প্যার কা তাকত ' দেখিতে যাইব।
সকাল সকাল খাইয়া দাইয়া সাজসজ্জায় লিপ্ত হইলাম। বাবুর প্যান্টালুনটা কিছুতেই কোমরে থাকিতে চাইছিলনা। অনেক কসরত করিয়া বেল্টের সর্বশেষ ফুটায় তাহাকে কিছুটা বশ মানাইয়াছি। যদিও মাঝেমধ্যে তাহাকে একটু উঠাইয়া জায়গায় আনিতে হয়।
পায়ে বুট ,হাতে ঘড়ি চোখে গগলস আর বাবুর সাধের সেন্টের শিশিটির অর্ধেক খালি করিয়া মাহিনার অবশিষ্ট কড়কড়ে ১০০ টাকা লইয়া দুগ্গা দুগ্গা করিয়া বাহির হইলাম।
পাড়ার লোকের চোখ এড়াইতে মেঠ পথ ধরিলাম। পাড়ার দু'টি কুকুর মাঠে হাড় চিবাইতেছিল। আমার বেশ তাদের পছন্দ হইলনা। তাহারা ক্ষেপিয়া গেলো। আমি গগলসটা খুলিবার পরে তাহারা কিছুটা শান্ত হইল। বাস ধরিবার জন্য দাড়াইলাম। এক ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করিল "কটা বাজে দাদা "। আমার গলা শুকাইয়া গেলো। ঘড়ির দিকে তাকাইয়া সূর্যের দিকে একটু টেরিয়া চাহিলাম। তারপর আমি যে টাইম বলিলাম তাহা ভদ্রলোকের মনঃপুত হইল না। আমাকে আপাদমস্তক দেখিল। আমি কুন্ঠিত বোধ করিলাম। আড়ালে যাইয়া ঘড়ি খুলিয়া ফেলিলাম। ঘড়ি আর গগলস পকেটে পুরিয়া বসে চাপিলাম। আমি গর্বের সহিত কন্ডাক্টরকে ১০০ টাকার নোটটি বাড়াইয়া দিলাম। কন্ডাক্টর তাহাকে পকেটস্থ করিয়া টিকেটে জমা লিখিয়া দিলেন। কপর্দকশূন্য অবস্থায় আমার অস্বস্তি বাড়াইয়া দিয়া কন্ডাক্টরটি বাসের ছাদে উঠিয়া গেল। আমি জানালার ধরে বসিয়াছি। আমার পশে এক দামড়া সাইজের লোক বসিয়াছে। ভুর ভুরে সেন্টের আবেশে ঘুমের চল করিয়া আমার কাঁধে মাথা রাখিল। আমি খুব একটা স্বস্তি বোধ করিলাম না। ঘামাইয়া যাইতেছিলাম। জানালাটা আরও একটু খুলিলাম। আগের সীটের রমণীটি অন্নপ্রাশনের ভাত উগরাইয়া দিল। আমি বাস হইতে নামিতে ব্যাস্ত হইয়া পড়িলাম।
শো ধরিবার জন্য জোরে হাঁটিলাম। বুট জুতার নিবিড় আলিঙ্গনে আমার পা রক্তাক্ত হইয়া উঠিল। তবুও আমি জুতা খুলিলাম না। টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়াইলাম। টিকেট কাটার পর দেখিলাম প্যান্টালুন হাঁটু পর্যন্ত নামিয়া গিয়াছে। আমি তাড়াতাড়ি ঠিক করিলাম।
রোদ হইতে হলে ঢুকিয়াছি, কিছু দেখিতে পাইতেছিলাম না। টিকিট পরীক্ষক লাইট দিয়া সিট দেখাইয়া দিল। কিন্তু বসাটা খুব সুখকর হইলনা। সীটটা গুটানো ছিল। আমি নিচে পড়িতে পড়িতে সামলাইয়া লইলাম।
কিছুপরে হলের আলো আঁধারিতে ধাতস্থ হইলাম। পর্দার নিবিড় প্রেমের ব্যাঞ্জনা হৃদয়কে শিহরিত করিল। আমার সামনের সিটের তরুণীটি আমার দিকে তাকাইল। আমি রোমাঞ্চিত হইলাম। বাবার উপদেশ "কামিনী কাঞ্চন হইতে দূরে থাকিও" -কে তোয়াক্কা করিলাম না। তরুণীটি ঘন ঘন আমার দিকে তাকাইয়া থাকিলো। আমার দিকে তাকাইয়া হাসিল। আমিও বত্রিশপাটি দাঁত বাহির করিলাম। তরুণীটি মুখ ফিরাইয়া লইল। আমি নিরাশ হইলাম। ভাবিলাম চোখে গগলসটি লাগাইবার উপযুক্ত সময় হইয়াছে। আস্তে আস্তে পকেট হইতে বাহির করিয়া পড়িলাম। অন্ধকারে আমাকে গগলস পরিহিত দেখিয়া পাশের লোকেরা মুচকি হাসিল। আমি গগলসটি পরিতে আর সাহস করিলাম না। হাফ টাইমে তরুণীটির তাকাইবার ব্যাপারটি উদ্ঘাটিত হইল। আমার পেছনে সুবেশ এক যুবা বসিয়াছিল। বোধকরি তরুণীটির বিশেষ পরিচিত হইবে। তরুণীটি ঐ যুবার দিকে তাকাইয়াছিল। আমি ভ্রম করিয়াছিলাম আমার দিকে তাকাইতেছিল বলিয়া। আমি বেশ বিধ্বস্ত হইয়া গেলাম।
সিনেমাহলের বাহিরে আসিয়া একটি ছিমছাম রেস্টুরেন্ট ঢুকিলাম। কিঞ্চিৎ ভোজন ও চা পানে কিছুটা তৃপ্ত হইলাম। ক্যাসকাউন্টারে বসা ভদ্রমহিলাটি মুচকি হাসিয়া বিলটি ধরাইল। আমিও হাসিলাম । বিলের দিকে চোখ পড়িতেই আমার মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করিল। চপের কি একটা উন্নত সংস্করণ আর চায়ের বিল যে ৫৭ টাকা হইবে- তা আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিতে পারি নাই। মনে হইলো ভদ্রমহিলা হাসিয়া হাসিয়া আমার রক্ত শুসিতেছে। আমি কম্পিত পায়ে বাহিরে আসিলাম। এদিকে আমার বিপদের সুযোগ লইয়া জুতাটাও জোর কামড় বসাইতেছে। আমার কাছে ৫টাকা অবশিষ্ট ছিল। এই টাকায় বাস কন্ডাক্টর গন্তব্য স্থান পর্যন্ত লইয়া যাইবেনা। মাঝ খানে নামাইয়া দিবার সম্ভাবনা প্রবল।
সমস্ত দিক বিচার বিবেচনা করিয়া সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলিলাম। জুতা,জামা ব্যাগে ভরিলাম। প্যান্টালুনটা হাঁটু অবধি গুটাইয়া দিলাম। গেঞ্জীটাকে আরো একটু ছিঁড়িয়া দিলাম। তারপর সদর্পে বাসের মাচায় উঠিয়া পড়িলাম। বাস চলিতে আরম্ব করিল।ফুরফুরে বাতাসে অনেকটা স্বস্তি অনুভব করিলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম আর কখনও বাবু সাজিবনা।।
ইস্কুল হইতে পালাইয়া স্টেশনে মনের দুঃখে বসিয়াছিলাম। বাড়িতে কি কহিব - তাহাই ভাবিতেছিলাম। হঠাৎ স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের উপর একটি বিজ্ঞাপনের দিকে নজর পড়িল। "গৃহ ভৃত্য চাই "। মাথায় বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল। নাচিতে নাচিতে বাড়ি গেলাম। যাইয়া বাবাকে কহিলাম ,"পড়িয়া কিসসু হইবে না "। পাড়ার দু চারটা বেকার যুবকের উদাহরণ দিলাম। -"তাহার চেয়ে কারখানায় কাজ লইলে তোমার সাহায্য হইবে - বুড়া বয়সে একটু আরাম পাইবে।" বাবা ভাবিয়াছিল আমাদের বংশে কেহ মাধ্যমিক পাশ করে নাই। আমি যদি তিন চার বার চেষ্টা করিয়াও মাধ্যমিক পাশটা করিয়া লই তাহাতে বংশের মুখোজ্ব্ল হইবে। ইদানিং বাবা আমার পড়ার দৌড় দেখিয়া ১৪বারের চেষ্টাতেও মাধ্যমিকের গন্ডি পারাইতে পারিব- সে আশা ছাড়িয়া দিয়াছেন। তাই আমার সংসাররূপ কারখানায় যোগদানের কোনো বাধা রইল না।
আমার মাইনে ৩০০ টাকা ঠিক হইয়াছে। গৃহস্বামী বেশ সুপুরুষ এবং রুচিসম্মত জামাকাপড় পরেন। সকলে বেশ সম্ভ্রম দেখায়। আমি যখন গৃহস্বামীর সাথে যাই তখন নিজের মলিন বেশের দিকে তাকাই, নিজেকে কেমন রামের হনুমানের মতো লাগে। মনে মনে ভবিতাম, আমার যদি এমন শার্ট-প্যান্ট, আর গগলেস থাকিত আমাকে সবাই সম্ভ্রম করিত।
একদিন সুযোগ আসিয়া গেলো। গৃহস্বামী ৭দিনের জন্য ভ্রমণে গেলেন। আমার বাড়ি সামলাইবার দায়িত্ব। মনে মনে স্থির করিয়া ফেলিলাম , বাবুর রেখে যাওয়া প্যান্ট শার্ট আর গগলস পরিয়া সিনেমায় 'প্যার কা তাকত ' দেখিতে যাইব।
সকাল সকাল খাইয়া দাইয়া সাজসজ্জায় লিপ্ত হইলাম। বাবুর প্যান্টালুনটা কিছুতেই কোমরে থাকিতে চাইছিলনা। অনেক কসরত করিয়া বেল্টের সর্বশেষ ফুটায় তাহাকে কিছুটা বশ মানাইয়াছি। যদিও মাঝেমধ্যে তাহাকে একটু উঠাইয়া জায়গায় আনিতে হয়।
পায়ে বুট ,হাতে ঘড়ি চোখে গগলস আর বাবুর সাধের সেন্টের শিশিটির অর্ধেক খালি করিয়া মাহিনার অবশিষ্ট কড়কড়ে ১০০ টাকা লইয়া দুগ্গা দুগ্গা করিয়া বাহির হইলাম।
পাড়ার লোকের চোখ এড়াইতে মেঠ পথ ধরিলাম। পাড়ার দু'টি কুকুর মাঠে হাড় চিবাইতেছিল। আমার বেশ তাদের পছন্দ হইলনা। তাহারা ক্ষেপিয়া গেলো। আমি গগলসটা খুলিবার পরে তাহারা কিছুটা শান্ত হইল। বাস ধরিবার জন্য দাড়াইলাম। এক ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করিল "কটা বাজে দাদা "। আমার গলা শুকাইয়া গেলো। ঘড়ির দিকে তাকাইয়া সূর্যের দিকে একটু টেরিয়া চাহিলাম। তারপর আমি যে টাইম বলিলাম তাহা ভদ্রলোকের মনঃপুত হইল না। আমাকে আপাদমস্তক দেখিল। আমি কুন্ঠিত বোধ করিলাম। আড়ালে যাইয়া ঘড়ি খুলিয়া ফেলিলাম। ঘড়ি আর গগলস পকেটে পুরিয়া বসে চাপিলাম। আমি গর্বের সহিত কন্ডাক্টরকে ১০০ টাকার নোটটি বাড়াইয়া দিলাম। কন্ডাক্টর তাহাকে পকেটস্থ করিয়া টিকেটে জমা লিখিয়া দিলেন। কপর্দকশূন্য অবস্থায় আমার অস্বস্তি বাড়াইয়া দিয়া কন্ডাক্টরটি বাসের ছাদে উঠিয়া গেল। আমি জানালার ধরে বসিয়াছি। আমার পশে এক দামড়া সাইজের লোক বসিয়াছে। ভুর ভুরে সেন্টের আবেশে ঘুমের চল করিয়া আমার কাঁধে মাথা রাখিল। আমি খুব একটা স্বস্তি বোধ করিলাম না। ঘামাইয়া যাইতেছিলাম। জানালাটা আরও একটু খুলিলাম। আগের সীটের রমণীটি অন্নপ্রাশনের ভাত উগরাইয়া দিল। আমি বাস হইতে নামিতে ব্যাস্ত হইয়া পড়িলাম।
শো ধরিবার জন্য জোরে হাঁটিলাম। বুট জুতার নিবিড় আলিঙ্গনে আমার পা রক্তাক্ত হইয়া উঠিল। তবুও আমি জুতা খুলিলাম না। টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়াইলাম। টিকেট কাটার পর দেখিলাম প্যান্টালুন হাঁটু পর্যন্ত নামিয়া গিয়াছে। আমি তাড়াতাড়ি ঠিক করিলাম।
রোদ হইতে হলে ঢুকিয়াছি, কিছু দেখিতে পাইতেছিলাম না। টিকিট পরীক্ষক লাইট দিয়া সিট দেখাইয়া দিল। কিন্তু বসাটা খুব সুখকর হইলনা। সীটটা গুটানো ছিল। আমি নিচে পড়িতে পড়িতে সামলাইয়া লইলাম।
কিছুপরে হলের আলো আঁধারিতে ধাতস্থ হইলাম। পর্দার নিবিড় প্রেমের ব্যাঞ্জনা হৃদয়কে শিহরিত করিল। আমার সামনের সিটের তরুণীটি আমার দিকে তাকাইল। আমি রোমাঞ্চিত হইলাম। বাবার উপদেশ "কামিনী কাঞ্চন হইতে দূরে থাকিও" -কে তোয়াক্কা করিলাম না। তরুণীটি ঘন ঘন আমার দিকে তাকাইয়া থাকিলো। আমার দিকে তাকাইয়া হাসিল। আমিও বত্রিশপাটি দাঁত বাহির করিলাম। তরুণীটি মুখ ফিরাইয়া লইল। আমি নিরাশ হইলাম। ভাবিলাম চোখে গগলসটি লাগাইবার উপযুক্ত সময় হইয়াছে। আস্তে আস্তে পকেট হইতে বাহির করিয়া পড়িলাম। অন্ধকারে আমাকে গগলস পরিহিত দেখিয়া পাশের লোকেরা মুচকি হাসিল। আমি গগলসটি পরিতে আর সাহস করিলাম না। হাফ টাইমে তরুণীটির তাকাইবার ব্যাপারটি উদ্ঘাটিত হইল। আমার পেছনে সুবেশ এক যুবা বসিয়াছিল। বোধকরি তরুণীটির বিশেষ পরিচিত হইবে। তরুণীটি ঐ যুবার দিকে তাকাইয়াছিল। আমি ভ্রম করিয়াছিলাম আমার দিকে তাকাইতেছিল বলিয়া। আমি বেশ বিধ্বস্ত হইয়া গেলাম।
সিনেমাহলের বাহিরে আসিয়া একটি ছিমছাম রেস্টুরেন্ট ঢুকিলাম। কিঞ্চিৎ ভোজন ও চা পানে কিছুটা তৃপ্ত হইলাম। ক্যাসকাউন্টারে বসা ভদ্রমহিলাটি মুচকি হাসিয়া বিলটি ধরাইল। আমিও হাসিলাম । বিলের দিকে চোখ পড়িতেই আমার মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করিল। চপের কি একটা উন্নত সংস্করণ আর চায়ের বিল যে ৫৭ টাকা হইবে- তা আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিতে পারি নাই। মনে হইলো ভদ্রমহিলা হাসিয়া হাসিয়া আমার রক্ত শুসিতেছে। আমি কম্পিত পায়ে বাহিরে আসিলাম। এদিকে আমার বিপদের সুযোগ লইয়া জুতাটাও জোর কামড় বসাইতেছে। আমার কাছে ৫টাকা অবশিষ্ট ছিল। এই টাকায় বাস কন্ডাক্টর গন্তব্য স্থান পর্যন্ত লইয়া যাইবেনা। মাঝ খানে নামাইয়া দিবার সম্ভাবনা প্রবল।
সমস্ত দিক বিচার বিবেচনা করিয়া সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলিলাম। জুতা,জামা ব্যাগে ভরিলাম। প্যান্টালুনটা হাঁটু অবধি গুটাইয়া দিলাম। গেঞ্জীটাকে আরো একটু ছিঁড়িয়া দিলাম। তারপর সদর্পে বাসের মাচায় উঠিয়া পড়িলাম। বাস চলিতে আরম্ব করিল।ফুরফুরে বাতাসে অনেকটা স্বস্তি অনুভব করিলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম আর কখনও বাবু সাজিবনা।।
সম্পাদক
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন