কথা শেষ হয়ে গেলে সম্পর্ক নাকি ফুরিয়ে যায় । এমনটাই ভেবে আসে মানুষ , বরাবর । সারাজীবনে কতবার আমাদের কত মানুষের সাথে সম্পর্ক হয় । তারপর ধীরে ধীরে আগ্রহের অভিমুখ পাল্টে যায় , জীবনের গুরুত্ব বদলে যায় , কথা কমে আসে , সম্পর্ক হারিয়ে যায়। একইরকম ঘটনা ঘটে রক্তের সম্পর্কের মানুষের সাথেও । একদিন যে যত কাছে থাকে , ধীরে ধীরে সে তত দূরেই চলে যায় । কথা কমে যায় , সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে পৌঁছায় ।
ছেলেবেলায় স্কুলে যে বান্ধবীকে ছেড়ে একমুহূর্ত থাকতে পারতাম না , কতক্ষণে স্কুলে গিয়ে মনের সব কথা কলকল করে বলবো বলে অপেক্ষা করতাম এখন সে শুধুমাত্রই ভার্চুয়াল বন্ধু । সেই বান্ধবীর জন্য হয়তো ইতিহাস প্রিয় হলেও সাবজেক্ট হিসেবে নিইনি কারন দুজনে একসাথে পড়বো । দুজনে এক কলেজে পড়বো বলে হয়তো সেকেন্ডলিস্টে যে সাবজেক্টে অনার্স পাচ্ছি তাই নিয়েছি ফার্স্ট লিস্টের অন্য বিষয় আর অন্য কলেজ ছেড়ে। বিয়েতে সবাইকে ছেড়ে শুধু তার সাথেই গভীর আলোচনা করেছি সব বিষয়ে কেমন করে কি হবে তার পরামর্শ চেয়ে । তারপর সে কোথায় , আমি কোথায় ! কমেন্ট লাইক সোশ্যাল মিডিয়ায় হলেও সামান্য ফোনে কথাটুকুও হয়না । দিন বদলে যায় , গুরুত্বের অভিমুখ বদলে যায় , কথা কমে যায় , সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায় ।
যে ঠাকুরদার সাথে ঘন্টাখানেক বকবক না করলে রাতে ঘুম হত না সেই ঠাকুরদা যখন মারা গেলেন সয়ে গেল তো । সয়ে গেল একা বিছানায় শোওয়া । গল্প না শুনেই ঘুমিয়ে পড়া । রামায়ন , মহাভারত , পৌরাণিক গল্প , রূপকথা ছাড়াও কত্ত কত্ত বিষয়ে দাদু আমাকে ছেলেবেলার প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন । কথা হওয়ার আর উপায় নেই । তবুও রোজ রাতে শোওয়ার সময় ঠাকুরদাকে মনে পড়তো । তারপর একদিন আর মনে পড়ে না । তেমন করে কই মনে পড়েনা তো আর ঠাকুমা , বড় জেঠু , জেঠিমা , দিদিমা , বড়মাসি , ছোট পিসেমশাইকে । কথা নেই , মনে পড়াও নেই , মানুষগুলো কেমন ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে জীবন থেকে ।
স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকলেই ছেলে হাসিমুখে ছুট্টে এসে জড়িয়ে ধরতো । স্নান সেরে তাকে পড়াতে বসলে আগে সে গড়গড় করে বলতো সারাদিনে কি কি হয়েছে । তার কষ্ট , আনন্দ , অভিমান , দুঃখ , রাগ সঅঅঅব , সব মাকে না জানানো অবধি শান্তি নেই । মা বিনে তার ভুবন নেই । তারপর একদিন কখন সে আমার চেয়ে লম্বা হয়ে গেল । এখন সে মনের কথা মনেই রাখতে শিখে গেছে । বয়সোচিত গাম্ভীর্য এসেছে । আর সে মাকে সব কথা বলেনা পাছে মা কষ্ট পায় , মায়ের মনের উপর চাপ বাড়ে । এমনও হয় সারাদিনে খেতে দেওয়ার সময় ছাড়া বিশেষ কথাই হয়না । এটাই জীবন , কথা ফুরিয়ে যায় , কথা শেষ হয়ে যায় । পাখি বাসা ছেড়ে উড়তে শেখে ।
মনে পড়ে কত মানুষের উপর অভিমান করে কথা বলিনি । কত মানুষকে অন্যায়ের শাস্তি দিতে কথা বন্ধ করেছি । আবার কত মানুষ তীব্র অভিমানে আমার সাথে কথা বলেনি । কেউবা রাগ করে কথা বলেনা। ছেলেবেলায় যে বইয়ের দোকানদার কাকুর সাথে অকারণে খোশগল্প করতাম এখন তার সাথে ওভাবে কথা বলতে কেমন বাধো বাধো ঠেকে । যাদের এককালে খুব আপন মনে হত এখন তাদের সাথে সেভাবেই কথা বলতে গেলে কেমন বোকা বোকা লাগে । এককালে যে পাড়ার ক্রাশের সাথে একটা কথা বলার জন্য মরে যেতাম , আজ হেলায় তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ডিলিট করে দি । এককালে সারারাত জেগে যার সাথে কথা বলেছি আজ তার সাথে কথাই হয়না প্রায়। দিন বদলে গেছে । সময় বদলে গেছে । জীবনের অভিমুখ বদলে গেছে । কথা ফুরিয়ে গেছে। সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে।
সদ্য মা বাবাকে হারানো এক বান্ধবী বলেছিল সন্ধ্যায় সিনেমা দেখাকালীন বা মেয়েকে পড়াতে বসানোর সময়ে তার মা বা বাবা ফোন করলে সে মাঝেমধ্যে বিরক্ত হত । ভুল জায়গায় হু হা করে কোনোমতে ঠেকনা দিত । হয়তো রোজ একঘেয়ে অসুখবিসুখের খবর শুনে ঘাবড়ে যেত বা করোনার পরিসংখ্যান শুনে । তার মায়ের বিশাল পারিবারিক বঞ্চনার গল্প শুনতেও তার মোটে উৎসাহ ছিল না । তারপর মা বাবা কয়েকমাসের ব্যবধানে পরপর চলে গেলেন । এখন সে সন্ধ্যায় নিজের ফোনে মা বা বাবার নম্বরের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে বসে থাকে । কিছুদিন পর হয়তো আর দেখবে না ।
কথা না বলে আমরা মানুষ হারিয়ে ফেলি । সম্পর্ক হারিয়ে ফেলি । কতকষ্টে একটা মানুষ , একটা সুসম্পর্ক অর্জন করি আমরা । শুধুমাত্র নিয়মিত কথার অভাবে তা শেষ হয়ে যায় । মানুষ সম্পর্ক খরচ হয়ে যায় অকারণে । কত ছোট জীবন । কত মূল্যহীন আমাদের রোজের চাওয়া - পাওয়া - দুঃখ -রাগ -রোষ-ক্ষোভ- মান- অভিমান -অভিযোগ । একটা মানুষ নেই হয়ে গেলে কদিন তাকে মনে রাখে মানুষ ? সেলিব্রিটির হেডলাইন থেকে পেজ থ্রিতে যেতে সময় লাগে তিনদিন । সাধারণ মানুষ বাতাসের মতন । বাতাস উষ্ণ হয়ে উপরে উঠে গেলে পার্শ্ববর্তী বাতাস ছুটে এসে শূন্যস্থান পূর্ণ করে যেমন। কেউ মরে গেলে আত্মীয় পরিজন কাছের মানুষ তেমনই নিজেদের যাপনের প্রয়োজনে তাকে বাদ দিয়ে দেয় ধীরে ধীরে । মরে যাওয়ার আগে তাই আর কাউকে বাদ দিতে ইচ্ছে করেনা । কথা ফুরোতে ইচ্ছে করেনা । মনে হয় কথা থাকুক । মানুষটা জমা থাকুক জীবনের হিসেবখাতায় । প্রাণপনে মানুষ জমাই তাই । কথা বাড়াতে পারিনা বলে লিখে যাই । দুহাজার কুড়ি আমাদের অনেককিছু কেড়ে নিয়েছে । আর কোনো সম্পর্ক হারাতে ইচ্ছে করেনা । মনে হয় সবাই থাকুক , কথায় থাকুক , মনে থাকুক । তাই সেই বহু ব্যবহৃত কথাগুলো আবার বলে যাই ,
" বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,
ক্ষমা করো আজিকার মতো
পুরাতন বরষের সাথে
পুরাতন অপরাধ যত। "
©স্বাতী ব্যানার্জ্জী।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন